ঘুষ ছাড়া মেলে না প্রধানমন্ত্রীর উপহার, প্রতিবাদে অফিস ঘেরাও

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জের মুজিব বর্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেওয়ার নাম করে এক ভূমি উপ-সহকারীকে ঘুষের টাকা নেওয়ার অভিযোগে অবরুদ্ধ করে রাখার খবর পাওয়া গেছে।

অবশেষে ২৪ ঘন্টা পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেখানে গিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে পাওনা টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে ওই ভূমি উপ-সহকারীকে উদ্ধার করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভারপ্রাপ্ত ভুমি সহকারী কর্মকর্তা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে জন প্রতি ১০ হাজার থেকে ৩০ টাকা নিয়েছেন।

বুধবার তার অন্যত্র বদলীর খবর পেয়ে ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসীরা সন্ধ্যা থেকে ওই ভূমি অফিসের সামনে বিক্ষোভ এবং সারারাত ও গতকাল বৃহস্পতিবার সারাদিন অবরোধ করেছেন। ওই ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা অফিসেরই একটি রুমে আবাসিক থাকেন।

অভিযুক্ত মো. আলাল উদ্দীন হাতিভাঙ্গা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গত ৩ বছর থেকে ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন। মুজিব শতবর্ষে ইতিমধ্যে ওই ইউনিয়নে প্রথম পর্যায়ে ৪টি ও ২য় পর্যায়ে ৩০ প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দ ছিলো। ৩য় পর্যায়ে ওই ইউনিয়নে কোনো ঘর না থাকলেও মো. আলাল উদ্দীন স্থানীয় আমখাওয়া, সরকারপাড়াসহ অন্যান্য গ্রাম থেকে শতাধিক লোকের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা করে ঘুষ বাণিজ্য করেন। দীর্ঘ দিন যাবত ঘর দেই দিচ্ছি বলে সময় পাড় করলে এলাকাবাসীদের মধ্যে সন্দেহ কাজ করে।

ইতিমধ্যে মো. আলাল উদ্দীনের অন্যত্র বদলীর মৌখিক সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। সে খবর এলাকাবাসাীদের মধ্যে জানাজানি হলে তারা টাকা ফেরতের জন্যে হাতিভাঙ্গা ভূমি অফিসে আসে। গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে একজন দুজন করে শতাধিক লোক অফিসে আসলে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কৌশলে তাদের সরিয়ে অফিসের দরজা জানালা বন্ধ করে ভেতরে অবস্থান নেন।

এদিকে বাইরে বিক্ষোভকারীরা ওই ভূমি অফিসারকে না পেয়ে সেই দিন সারারাত ও গতকাল বুধবার বিকাল পর্যন্ত অফিসের সামনে অবস্থান অবরোধ করেন। তাদের কথা তারা টাকা না নিয়ে বাড়ী ফিরবেন না। পরে গতকাল বিকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় অভিযোগকারীদের সাথে আলাপ আলোচনা করে অভিযুক্ত ওই ভূমি কর্মকর্তাকে সেখান থেকে উদ্ধার করে আনেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. আলাল উদ্দীন শুধু ঘর দেওয়ার কথা বলে টাকা নেননি। তিনি অনেক মানুষের কাছে খারিজ করা ও ভুমিহীন বন্দোবস্তের কথা বলে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ অবস্থায় সে অন্য অফিসে বদলী হয়ে গেলে সাধারণ মানুষদেরকে তার কাছে পাওনা টাকা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।

ভূক্তভোগী সরকারপাড়া গ্রামের মো. জনাব আলীর ছেলে মো. সোনাহার বলেন, বাড়ীতে আমার থাকার ঘর নেই। ঘর উঠানোর জন্যে খাম তৈরী করেছি। সে সময় ওই ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. আলাল উদ্দীন ঘর দেওয়ার কথা বলে আমার কাছে ১০ হাজার টাকা নেন। আমি তৈরীকৃত খাম বিক্রি করে টাকা দেই।

সরকারপাড়া গ্রামের আরেক ভূক্তভোগী নাদের মিয়ার স্ত্রী অমিলা বলেন, আমি ভিক্ষে করে খাই। জমাজমি নেই। খাস জমিতে বসবাস করছি। আলাল আমার কাছে ঘর দেওয়ার কথা বলে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছে। আমি টাকা ফিরিয়ে চাই এবং এর বিচার চাই। এ ব্যাপারে ভূক্তভোগী ভারপ্রাপ্ত ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা মো. আলাল উদ্দীন বলেন, আমার কাছে লোকজন টাকা পাবে এ কথা সত্য। আমি সামনের মাসের ৭ তারিখে সব টাকা পরিশোধ করবো।

অবশেষে বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেল টার দিকে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার একেএম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ সেখানে গিয়ে ভুক্তভোগী পাওনাদারদের সাথে কথা বলেন। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করেন। তারা যদি সত্যিকার অর্থেই বিভিন্ন কাজের জন্য তাকে টাকা দিয়ে থাকেন তবে সেই পাওনা টাকা ফেরত পাবেন। অবশেষে ইউএনও’র কথায় আশ্বস্ত হয়ে পাওনাদাররা সেই ভূমি উপ-সহকারীকে তার হাতে তুলে দেন এবং আলোচনার জন্য তাদের প্রতিনিধিরা উপজেলা পরিষদে যান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা একেএম আব্দুল্লাহ বিন রশিদ বলেন, অপরাধী সে যেই হোক, তাকে ক্ষমা করা হবেনা। প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর দেওয়ার কথা বলে যদি কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকে বা প্রতারণা করে থাকে তাকে ক্ষমা করা হবে না। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রাথমিক হিসাবে মো. আলাল উদ্দীনের নামে ৮৫ জন ভূক্তভোগীদের কাছ থেকে ৮ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। ভূক্তভোগীদের সাথে আলাপ আলোচনা হিসাব নিকাশ চলছে। ভূক্তভোগীদের সবটাকা পরিশোধ তাকে করতে হবে এবং এ অন্যায়ের শাস্তি তাকে পেতে হবে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*